মোট পৃষ্ঠাদর্শন

বৃহস্পতিবার, ২ জুন, ২০১১

জীবনানন্দ এক শ পঞ্চাশ ভাগ জৈবনিক

ভূমেন্দ্র গুহর জন্ম বরিশালে। পেশায় ছিলেন চিকিৎসক। জীবনানন্দ দাশের পাণ্ডুলিপি উদ্ধার ও অন্যান্য কাজে ব্যয় করেছেন ২৮ বছর। সমপ্রতি ঢাকায় এসেছিলেন এই কবি। তার এ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আনিসুল হক ও জাফর আহমদ রাশেদ।
জাফর আহমদ রাশেদঃ জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে আপনার ও আপনার বন্ধুদের দুই বছরের পরিচয়। পরিচয়টা কীভাবে হলো?
ভূমেন্দ্র গুহঃ বালাদেশের তরুণ, ছেলেমানুষ কবিরা কয়েকটি ?কবিতা পত্রিকা? করেছিল। এর মধ্যে ?৫২ সালে আমরা যারা ময়ূখ করেছিলাম তারা আক্ষরিক অর্থেই ছিলাম উদ্বাস্ত-, চালচুলোহীন। তখন যেকেনো তরুণ কবিগোষ্ঠীর একটা কবিতা স্কুলে ঢুকে পড়ার ধারা ছিল। যেমন বুদ্ধদেব বসুর স্কুল বৌদ্ধ, বিষ্ণু দের স্কুল বৈষ্ণব। আমরা কোনো স্কুলে বা দলেই ছিলাম না। এরা যেভাবে সাহিত্য করতেন আর আমাদের যে জীবনযাপন, আমরা যেভাবে বেঁচে থাকছি, এগুলো ঠিক মিলছিল না। আমাদের মনে হতো, জীবনানন্দ দাশও উদ্বাস্ত-, বোধহয় সেই বেদনাটা বোঝেন। ওঁর কবিতা হয়তো আমাদের জীবনযাপনের কাছাকাছি হয়ে উঠছিল। তিনি স্কুলে বিশ্বাসও করতেন না। ওঁর কাছে লোকজন গেলে বিদায় করতে পারলে বাঁচেন। ময়ূখ-এ তাঁর কবিতা নেওয়ার জন্য আমরা তাঁর ল্যানসডাউনের বাড়ির সামনে ঘোরাঘুরি করছি, ঢোকার সাহস করতে পারছি না। তাঁর ছোট বোন সুচরিতা দাশের সাহায্যে আমরা তাঁর বাড়িতে ঢুকতে পারলুম। একসময় আমরা জীবনানন্দের পরিবারের প্রায় অঙ্গীভূতই হয়ে গিয়েছি, বিশেষত ব্যক্তিগতভাবে আমি। তার মানেই যে জীবনানন্দের সঙ্গে খুব অন্তরঙ্গতা গড়ে উঠেছিল, তা নয়। বা তিনি আমাদের সঙ্গে অনেক কথা বলতেন বা সাহিত্য-আলোচনা করতেন, তাও নয়। উনি সাহিত্য আলোচনার ধারেকাছেই ছিলেন না। উনি একটু অবিশ্বাসপ্রবণ ছিলেন। যেহেতু তাঁর বোন আমাদের নিয়ে গেছেন, সুতরাং তিনি আমাদের বিশ্বাস করলেন।
আনিসুল হকঃ আপনার বয়স তখন কত?
ভূমেন্দ্রঃ আমি তখন মেডিকেল কলেজে ফাসর্ট ইয়ারে পড়ি। ধরুন ১৯ বছর।
রাশেদঃ এটা কি ১৯৫২ সাল?
ভূমেন্দ্রঃ হ্যাঁ, ?৫২ সাল। ঘুরেছি, কিন্ত- তিনি লেখাটেখা দেননি।
আনিসঃ তাঁর জীবদ্দশায় ময়ূখ-এ তো তাঁর কবিতা বেরিয়েছিল?
ভূমেন্দ্রঃ একটা কবিতা বেরিয়েছিল। শারদীয় সংখ্যায়। দেখে তিনি বলেছিলেন তোমরা খুব যত্ন করে করেছ। আমাদের অজ্ঞাতে তাঁর বোনকে বলেছিলেন, এই ছেলেগুলো অন্য রকম।
রাশেদঃ প্রথম পরিচয়ের মুহূর্তটা কেমন ছিল? সমপর্কটা কীভাবে এগিয়েছে?
ভূমন্দ্রঃ ওই যে বাড়ির সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতাম। ভেতরে ঢোকার সাহস পাইনি। একদিন দিদি বললেন, তোমরা এখানে ঘোরাঘুরি করো, ব্যাপার কী? তখন তাঁকে বললাম। তিনি নিয়ে গেলেন। বোনকে খুকি ডাকতেন, খুব ভালোবাসতেন। খুকি আমাদের নিয়ে গেছেন, বলেছেন, ভূমেন বরিশালের লোক, কালীবাড়ির সামনে বাড়ি ছিল, আমাকে ধরেছে, তোমার কবিতা চাই। উনি বিশ্বাস করলেন না। খানিক বাজিয়ে নিলেন।
আনিসঃ আপনার জন্ম কোথায়?
ভুমেন্দ্রঃ জন্ম পিরোজপুরে। বাবা ওখানে চাকরি করতেন। বাড়ি মৈশালী গ্রামে। স্বরূপকাঠি থানা, পিরোজপুর ছিল মহকুমা। জেলা বরিশাল।
আনিসঃ আপনি কলকাতা গেলেন কবে?
ভূমেন্দ্রঃ আমি গেছি ১৯৪৬ সালে।
রাশেদঃ আপনি বলছিলেন, আপনারা যাঁরা ময়ূখ করছিলেন, সবাই ছিলেন আক্ষরিক অর্থে উদ্বাস্ত-, অর্থাৎ আপনারা সবাই পূর্ববঙ্গের লোক ছিলেন-সমীর, প্রতাপ, স্মেহাকর, জগদিন্দ্র সবাই?
ভূমেন্দ্রঃ সবাই। ওরা ময়মনসিংহের গ্রুপ। আমি শুধু বরিশালের। আরও ইতিহাস আছে। ময়ূখ করেছিল কয়েকজন ডাক্তারি-পড়া ছাত্র। পূর্বাশা পত্রিকায় আমার একটা পদ্য বেরিয়েছিল। দেখে ওরা ভাবল, আমি কবি। ছাত্ররা ?কপি? বলে ঠাট্টা করত। ওরা আমাকে ডেকে নিয়েছিল। লিটল ম্যাগাজিন অনেকে মিলে শুরু করে, আসলে কাজকর্ম একজনই করে। ধীরে ধীরে দেখা গেল, আমিই কাগজ কিনতে যাই, আমিই প্রুফ দেখি। গতরের খাটনিটা আমিই করি। একসময় ডাক্তারি-পড়া ছাত্রদের সিটম কমে গেল। ওরা ছেড়ে দিল। তখন আমি কিন্ত- নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। ভাবতে লাগলাম, কাদের নিয়ে আবার একটা গোষ্ঠী করা যায়। দেশ পত্রিকায় স্মেহাকর ভট্টাচার্যর একটা কবিতা বেরিয়েছিল। পড়ে মনে হলো ভালো। গড়িয়াহাট এলাকায় আবিষকার করলুম স্মেহাকরকে। সে তাঁর দলবল নিয়ে চলে এল। এভাবে ময়ূখের নতুন একটা গোষ্ঠী তৈরি হলো।
আনিসঃ ময়ূখ পড়ে মনে হয় আপনারাই আগে ধরতে পেরেছিলেন যে এই লোক অন্য রকম। ৫৪ বছর পর বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় কবি হবেন তিনি-তখন নিশ্চয় এতটা ভাবেননি। কিন্ত- কিছু একটা তো পেয়েছিলেন। কীভাবে বুঝেছিলেন?
ভূমেন্দ্রঃ আমাদের মনে হয়েছিল, ওরা যদি বৌদ্ধ বা বৈষ্ণব হয়, জীবনানন্দ এক শ পঞ্চাশ ভাগ জৈবনিক। জীবন ছাড়া উনি কিছু জানেননি। দুঃখ, কষ্ট, ব্যর্থতা, মৃত্যু, জীবনের ক্ষয়ে যাওয়া-এগুলো খুব জেনেছিলেন তিনি। তথাকথিত ?আধুনিকতা? বলে একটা কথা ছিল তখন-যা ধনতন্ত্রের মুখোশ, মুখচ্ছবি। তিনি ধরতে পেরেছিলেন, এই মুখচ্ছবিতে ক্ষয়ে যাওয়া ছাড়া কিচ্ছু নেই। সে জন্য জীবনানন্দের ধূসর পাণ্ডুলিপিতে দেখবেন শুধু ক্ষয়ে যাওয়ার ছবি। আমরাও ক্ষয়ে যাওয়া। যাদের পেটে ভাত নেই, যারা বিতাড়িত হয়েছে, যারা শেয়ালদা সেটশনে সরকারের দেওয়া লপসি খাচ্ছে, কাউকে কলোনিতে থাকতে হয়েছে, তাদের জীবনযুদ্ধ তো মারাত্মক। সেই কথাগুলো বামপন্থীরা বলছেন তাত্ত্বিকভাবে। এই করলে সেই করলে সেই ইউটোপিয়ান সমাজ আমরা পাব। তা পাইনি যে দেখতেই তো পাচ্ছেন। সেটা আমাদের টানেনি। পাশাপাশি আনন্দ, নান্দনিকতা, ঈশ্বর, শুভবোধ-এও টানেনি আমাদের। আমরা উড়ে হোটেলে খাই। কোনোদিন ১০ পয়সার পাউরুটি খেয়ে লাঞ্চ করেছি। আমাদের থাকার জায়গা নেই। বিনে পয়সায় বলে একটা স্কুলবাড়ির ছাদে ভূতে পাওয়া ঘরে থাকছি আর স্কুলটা পাহারা দিচ্ছি। তাই জীবনানন্দ পড়তে পড়তে মনে হতো, তিনি হয়তো আমাদের কথাগুলোই বলছেন।
অনেক পরের একটা কথা এ প্রসঙ্গে আগে বলে রাখি। জীবনানন্দ নামের ওপর ?নির্জনতার কবি? ছাপটা পড়ে গিয়েছিল। সুভাষ মুখোপাধ্যায় জীবনানন্দ দাশকে খুব গালমন্দ করে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন পরিচয় পত্রিকায়, রবীন্দ্র পুরস্কার পাওয়ার পরে। আমরা খুব রেগে গিয়েছিলুম। ওই চিলেকোঠায় বসে আমরা এগুলোর প্রতিবাদ লিখেছিলুম। লিখে জীবনানন্দকে শোনাতে গিয়েছি। মাঝখানে তিনি থামিয়ে দিলেন। বললেন, ?দেখো, এসব লিখে, ছাপিয়ে কিছু হয় না। আমি যখন থাকব না, এঁরাও যখন থাকবেন না, তোমরাও নির্ঘাত বুড়ো হয়ে যাবে, তখন হয়তো এ কবিতাগুলোর কোনো মূল্যায়ন হবে। এখন এসব শুধু শুধু কেন?? তাঁর মৃত্যুর পরে লেখাটা ছাপা হয়েছিল ময়ূখ পত্রিকায়।
রাশেদঃ ওই সময়ে জীবনানন্দের কিছু বিরুদ্ধতা ছিল। সজনীকান্ত দাশ ছিলেন, বামপন্থীরা ছিলেন। জীবনানন্দের জন্য তা কতটা দুর্বিষহ ছিল? তারা কি পরে ভুল বুঝতে পেরেছিলেন? তিনি কতটা স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।
ভূমেন্দ্রঃ স্বীকৃতির প্রশ্নই ছিল না। আড়াই হাজারের ওপর কবিতা লিখেছেন জীবনানন্দ, ছাপিয়েছেন মাত্র ১৬৬টি। শনিবারের চিঠি বা সজনীকান্ত দাশ তাঁকে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করেছেন। বুদ্ধিমানের মতো সমালোচনা করেছেন বামপন্থীরা। তাঁকে বলেছেন পলায়নপর, প্রতিক্রিয়াশীল, জীবনযুদ্ধে নিরুৎসাহজনক; বলেছেন জীবনানন্দের কবিতা পুরোনো বাংলার শুঁড়িখানার মতো। বলেছেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। জীবনানন্দের মৃত্যুর পরে মনীন্দ্র রায় বলেছেন, আমি আমার প্রবন্ধ তুলে নিচ্ছি। সজনীকান্ত দাশও ভুল বুঝতে পেরেছিলেন পরে। সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলেছেন, আমি তাঁকে বুঝতে পারিনি। আমার মার্ক্সবাদের জ্ঞান কাঁচা ছিল।
রাশেদঃ জীবনানন্দের মৃত্যুর পরে ময়ূখ করার জন্য আপনারা লেখকদের কাছে কাছে গেলেন লেখা চাইতে। লেখকেরা কেমন আচরণ করেছেন?
ভূমেন্দ্রঃ নীহাররঞ্জন রায়কে জীবনানন্দ খুব আস্থায় নিয়েছিলেন। ব্রহ্মদেশে তিনি যখন কালচারাল উপদেষ্টা, জীবনানন্দ তাঁকে চিঠি লিখেছেন। লেখার জন্য তাঁর কাছে অনেক ঘোরাঘুরি করলাম। শেষ পর্যন্ত বললেন, ?আমি সভাপতি হিসেবে নিখিল ভারত বঙ্গ সংস্কৃতি সম্মেলনে যে বক্তৃতাটি দিয়েছি, তাতে জীবনানন্দকে নিয়ে বলেছি। ওই অংশটা ছেপে দাও।? আমরা ওটা কেটে ছেপে দিয়েছি। অমলেন্দু বসু আজীবন ঘুরিয়েছেন, দেননি। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত একমাত্র লোক, সবচেয়ে বেশি বদনাম ছিল তাঁর, এককথায় লেখা দিয়েছেন।
আনিসঃ জীবনানন্দ স্নরণসংখ্যা করার জন্য বুদ্ধদেব বসু কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তর কাছে গিয়েছিলেন। সুধীন দত্ত বলেছিলেন, যে কবি নয় তার জন্য স্নরণসংখ্যা করার দরকার কী।
ভূমেন্দ্রঃ সুধীন্দ্রনাথ দত্ত জীবনানন্দকে মনে করতেন স্বভাবকবি, গ্রাম্য কবি। জীবনানন্দ দাশ যে লেখাপড়া জানা ধীশক্তিসমপন্ন ছিলেন, তিনি বিশ্বাস করতেন না। তাঁর লেখা পড়ে ধরা যেত না। সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে শেষ অনুরোধ করেছিলেন সঞ্জয় ভট্টাচার্য-জীবনানন্দ তো তবু আপনাকে নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন, আপনাকে আমাদের সবচেয়ে বড় নিরাশাকরোজ্জ্বল কবি বলে উল্লেখ করেছেন। জীবনানন্দের মৃত্যুর পরে পূর্বাশার এই যে সংখ্যাটা বেরোচ্ছে, তাতে আপনি একটা লেখা দিন। অন্তত তুল্যমূল্য হবে। সুধীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ?আমার ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়েছে, তাই লিখতে পারছি না।?
রাশেদঃ জীবনানন্দ যখন মারা গেলেন, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত কি এসেছিলেন দেখতে?
ভূমেন্দ্রঃ প্রথম এসেছিলেন সুধীন দত্ত। অভিজাত ব্যক্তি। অর্থের আভিজাত্য নয়, মননশীলতার, সংস্কৃতির আভিজাত্য। হরিণের চামড়ার চটি পায়ে, গায়ে ড্রেসিং গাউন, চুলটুল ভালো করে আঁচড়ানো নয়। হাতে একগুচ্ছ রজনীগন্ধা। সিঁড়ি দিয়ে আস্তে আস্তে উঠলেন। জীবনানন্দের মাথার কাছে ফুলের তোড়াটি রেখেছেন। এক মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে-এক মিনিট-তারপর পেছনে হেঁটে সিঁড়ির কাছে এসে জুতা পায়ে দিয়ে নেমেছেন।
রাশেদঃ ?৫২ সাল থেকে আপনি জীবনানন্দ দাশের বাসায় যান। ?৫৪ সালে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে আপনার কোনো কথা হয়নি?
ভূমেন্দ্রঃ না।
রাশেদঃ তিনি যখন মারা গেলেন, তাঁর ঘরের পুরো পরিবেশটা ঠিক কেমন ছিল?
ভূমেন্দ্রঃ ভোররাতে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতাল থেকে জীবনানন্দের মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা অশোকানন্দ দাশের ফ্লাটে। জীবনানন্দ শেষ জীবনে বেঁচে থেকেছেন ভাই-বোনের মোটামুটি আর্থিক সাহায্যে; তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর পুরো পরিবারকে দেখাশোনা করেছেন তাঁর ছোট ভাই অশোকানন্দ। জীবনানন্দকে অশোকানন্দের বাড়ির দোতলায় দরজার দিকে মুখ করে শুইয়ে দেওয়া হয়। দাড়ি কামিয়ে, একটা জামা পেছন দিকে কেটে পরিয়ে সুন্দর করে তাঁকে সাজিয়ে দেওয়া হলো। তারপর ব্রাহ্মমতে রবীন্দ্রসংগীত গাইতে লাগলেন মহিলারা। যদিও জীবনানন্দ দাশ রবীন্দ্রসংগীতের ভক্ত ছিলেন না। তখনো ওঁর স্ত্রী আসেননি। তিনি এলেন সকাল নটায়। এখনো ছবিটা আমার মনে আছে। সাদা শাড়ি, হলুদ পাড়, স্মান করে চুলটুল আঁচড়ে এসেছেন। তখনো গায়ে সুগন্ধ রয়েছে। এসে সরাসরি ওপরে উঠে গেলেন। ওপরে ঝুলবারান্দা ছিল। অন্যরা চলে গিয়েছিল। আমি রয়ে গেছি। এই বসছি এই ঘুরে বেড়াচ্ছি। কেন? সুচরিতা দিদি বলেছেন, ?ভূমেন, তুমি যাবে না।? রাত জেগেছি, স্মান করিনি, মুখ ধুইনি। মাঝেমধ্যে দিদি আমাকে চা খেতে দিচ্ছেন। বাড়ির সামনে একটা বিরাট বকুলগাছ আছে। ততক্ষণে বকুলগাছের নিচে ভিড় জমে গেছে। সেখানে অচিন্ত্য, বুদ্ধদেব, সজনী-অনেক বড় বড় লোকেরা আছেন। সুভাষ মুখোপাধ্যায় বসবস থেকে এসেছেন। তরুণ কবিরা তো আছেনই। সেই ভিড় পেরিয়ে লাবণ্যপ্রভা এলেন। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলেন। এসেই আমাকে প্রশ্ন করলেন, এই প্রথম আমার সঙ্গে কথা বললেন, ?এত সব লোক কেন এসছেন, বলো তো! সজনীবাবুকে দেখছি, সঞ্জয়বাবু, বুদ্ধদেব, সুভাষ এসছেন, এত লোক কেন, বলো তো!? বললাম, ?উনি মারা গেছেন, খবর পেয়ে সবাই এসছেন।? ?তাহলে তোমাদের দাদা কি বড় লেখক ছিলেন? বড় কবি ছিলেন?? আমি বললাম, ?ছিলেন নিশ্চয়, না হলে এত লোক এসছেন কেন?? আমার দিকে একটু তাকিয়ে থেকে বললেন, ?আচ্ছা, তোমার দাদা তো বড় কবি ছিলেন, বাংলা সাহিত্যকে নিশ্চয় অনেক দানও করে গেলেন। কিন্ত- আমার জন্য কি রেখে গেলেন, বলো তো!?
রাশেদঃ তাঁকে যাঁরা হাসপাতালে দেখতে গেছেন, আপনি লিখেছেন তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন।
ভূমেন্দ্রঃ মুখ্যমন্ত্রী মানে পশ্চিমবাংলার বিধানচন্দ্র রায়। বাংলাদেশ আমি দুভাবে লিখি-?বাংলাদেশ?, আর পশ্চিমবঙ্গ হলে ?বাংলা দেশ?।
আনিসঃ আচ্ছা, রূপসী বাংলার কবিতাগুলো তো তাঁর ট্রাংকে ছিল। যদিও এ নামে ছিল না। কেন এগুলো প্রকাশ করেননি।
ভূমেন্দ্রঃ এ বিষয়ে জীবনানন্দের লেখা চিঠিই ছিল। তাঁর অনুরাগী ভক্ত প্রভাকর সেনকে লেখা। তখন আমি প্রকারান্তরে জীবনানন্দের লেখার বাকসোর মালিক হয়ে গেছি। খাতাপত্র রোদে দিই, নিমপাতা দিই।
রাশেদঃ ওগুলো আপনি পেলেন কী করে?
ভূমেন্দ্রঃ জীবনানন্দের মৃত্যুর পর আমি ও সুচরিতা দিদি ল্যানস রোডের ভাড়া বাড়ি থেকে তাঁর সমপত্তিগুলো অশোকানন্দের বাড়িতে নিয়ে এলাম। সমপত্তি মানে একটা গোটানো মাদুর, একটা কেরোসিনের টেবিল, একটা চেয়ার। খবরের কাগজ ছিল অনেক, ওগুলো আনিনি। খাটের নিচে ছিল চারটে কালো ট্রাংক। একটাতে জামাকাপড়, একটাতে বই আর দুটোতে ছিল ম্যানুস্ক্রিপ্ট। জীবনানন্দের শ্রাদ্ধ হবে, শ্রাদ্ধে ছবি লাগে, মালা দিতে হয়। তিনি ছবি তোলেননি জীবনে। ভাবতেন, আমি দেখতে কুৎসিত, দেখতে সুন্দর নই। অশোকানন্দ বললেন, ?বাকসো ঘেঁটে দেখো তো, দাদার কোনো ছবি পাওয়া যায় কি না?? সেই প্রথম বাকসে আমার হাত পড়ল। খুঁজে একটা গ্রুপ ফটো পাওয়া গেল। এখন তাঁর যে ছবিটা আপনারা দেখেন সেটা ওই গ্রুপ ফটো থেকে কেটে ডি রতনে নিয়ে গিয়ে রংটং লাগিয়ে তৈরি করা। ওই করতে গিয়ে একটা খাম পেলাম। তাতে কয়েকটি চিঠির একটা প্রভাকর সেনকে লেখা-একসময় ভাবাক্রান্ত হয়ে খুব অল্প সময়ে দিন পনেরোর ভিতরে একসঙ্গে অনেকগুলি কবিতা লিখে ফেলেছিলাম বাঙালি এবং আবহমান বাংলাকে উদ্দেশ্য করে। সেই কবিতাগুলির নামও ভেবে রেখেছিলুম ?বাংলার ত্রস্ত নীলিমা?। এখন আর সে লেখাগুলো ছাপা যায় না। এখন আমার কবিতার মেজাজ অনেক পাল্টে গেছে, এই কবিতাগুলো তখন হয়তো ছাপা গেলেও যেতে পারত। সেই খাতাটা খুঁজতে শুরু করলাম। ছ নম্বর খাতাটা বার করলাম। সেখানেই কবিতাগুলো আছে। অশোকানন্দকে দেখালাম, ?মেজদা, এগুলো কি সেই কবিতা হবে?? তিনি বললেন, নিশ্চয় হতে পারে। বললাম, ?এটা ছাপিয়ে দিলে কেমন হয়? জীবনানন্দ ছাপাননি, এখন আমরা ছাপাচ্ছি।? সিদ্ধান্ত হলো সেটা ছাপানো হবে, জীবনানন্দের চিঠিটাকে বইটার পেছনে দিয়ে দেওয়া হবে। ম্যানুস্ক্রিপ্ট তৈরি করে সিগনেট প্রেসে দিয়ে আসার সময় চিঠিটার কথা দিলীপ গুপ্ত মশাইকে বলে এলাম। সবই ঠিক ছিল। বইটা যখন বেরোল, দেখলাম চিঠিটা নেই।
আনিসঃ ?রূপসী বাংলা? নামটা কে দিলেন?
ভূমেন্দ্রঃ দিলীপকুমার গুপ্ত। তিনি বললেন, ?বাংলার ত্রস্ত নীলিমা? নামটা ভারী, জিভে আটকে যায়। একটি ক্যাচি নাম দেব, জীবনানন্দ দাশের কবিতা থেকেই দেব। জীবনানন্দ ?ত্রস্ত? বলতে গেলেন কেন? আমার বক্তব্য- কবিতাগুলো দেশপ্রেম-টেশপ্রেম নয় কিছু, ওইগুলো হচ্ছে আমাদের যে ইনডিজেনাস সভ্যতা, অলিখিত সংস্কৃতি, উপনিবেশিকতা তাকে শেষ করে দিল। জীবনানন্দ যখন দেখলেন, বাংলাদেশের নীলিমা শেষ হয়ে যাচ্ছে, কাঁপছে, ত্রস্ত, ভীত, উনি ডকুমেন্টারি ফিল্ম তৈরি করে গেলেন। যে জিনিস ছিল, থাকবে না, যাচ্ছে, এই জিনিসটা মনে হয় উপ্ত ছিল ?ত্রস্ত? কথাটার মধ্যে।
রাশেদঃ আপনার কি মনে হয় না সেই নামটাই ভালো ছিল?
ভূমেন্দ্রঃ অ-নে-ক ভালো ছিল।
আনিসঃ কতগুলো খাতা ছিল ট্রাংকে?
ভূমেন্দ্রঃ গুনিনি। কবিতার খাতাগুলি গেছে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে। ৪৮টা খাতা। প্রবন্ধের খাতাগুলোও ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে গেছে।
আনিসঃ এত কিছু পেলেন আপনি ২১ বছর বয়সে। এখন ৭০ পেরিয়েছেন। এতটা বছর ধরে আপনি জীবনানন্দ দাশ নিয়েই আছেন?
ভূমেন্দ্রঃ না না। ?৬৮ সাল পর্যন্ত জীবনানন্দ নিয়ে ছিলাম। ১৪ বছর। ডাক্তারি যখন পাস করে গেলাম, আমার বড় ডাক্তার হওয়া লোভ হলো। সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে আমি বড় ডাক্তার হওয়ার সাধনায় লেগে গেলাম।
আনিসঃ আপনি কি হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ?
ভূমেন্দ্রঃ আমি হার্ট সার্জন। ইনডিয়ান পেনিনসুলায় প্রথম যে ওপেন হার্ট সার্জারি হয়, আমি সেই টিমে ছিলাম। ১৯৬২ সালের এপ্রিল মাসে। যা-ই হোক, বড় ডাক্তার একরকমভাবে হলাম মোটামুটি। ১৯৯৪ সালে রিটায়ার করে ভাবলাম আর ডাক্তারি করব না। জীবনানন্দের মেয়ে মঞ্জুশ্রী মারা গেলেন ১৯৯৫-এ। ওঁর মৃত্যুর পরেই এই খাতাগুলো আবিষকৃত হলো। ১৯৯৬-৯৭ সালে জীবনানন্দের ভাতুষপুত্র একদিন আমার কাছে হাজির। অমিতানন্দ দাশ। বললেন, ?দেখুন, এতগুলো ম্যাটেরিয়াল পাওয়া গেছে।?
রাশেদঃ এগুলো ওই চার ট্রাংক খাতার বাইরে?
ভূমেন্দ্রঃ অন্য বই নষ্ট হয়ে যাবে বলে পোকায় ধরা খাতাগুলো ন্যাশনাল লাইব্রেরি নেয়নি। সেগুলো বিছানার চাদরে বস্তাবাঁধা অবস্থায় মঞ্জুশ্রীর দূর-সমপর্কীয় এক কাজিন-সিসটারের বাড়িতে ছিল। ও বাড়িতে বিয়ে হবে, ওরা ভাবল, কাগজগুলো কোথায় ফেলব। জীবনানন্দের খুড়তুতো বোন জ্যোৎস্মা দাশগুপ্তর পরামর্শে ওগুলো অমিতানন্দকে দেওয়া হলো। খাতাগুলোতে তখন ছোট ছোট উইয়ের ঢিবি। অমিতানন্দ অনেক চেষ্টা করেও কোনো লেখার লেজ আর মুড়ো মেলাতে পারলেন না। ইঞ্জিনিয়ার মানুষ, কী করে পারবেন?
রাশেদঃ এর জন্য তো একজন ডাক্তার দরকার।
ভূমেন্দ্রঃ হা-হা। উনি এসে একদিন আমাকে বললেন, আপনি এগুলো একবার দেখলে খুব ভালো হতো। বললাম, ?বাবা, তুমি তা আমাকে বাঁচিয়েই দিলে। আমার কাজকর্ম কিছু নেই। আমি করে দেব।? তারপর লেগে পড়লাম। এখনো লেগে আছি।
আনিসঃ আগে ১৪ পরে ১৪ বছর এই কাজটা করলেন, নিজের জীবনটা সমপর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
ভূমেন্দ্রঃ আমি একজন সাধারণ মানুষ। আদার যাকে বলে ইংরেজি ভাষায়-অপর, নিজেকে আমি তার চেয়ে বেশি কিছু মনে করি না। বাংলাদেশে এসে হঠাৎ করে দেখছি ইন্টারভিউ দিচ্ছি। ইন্টারভিউ-টিন্টারভিউ আমি কখনো দিইনি। এই কাজটা আমার কাছে পড়েছে। কাজটা শেষ করতে হবে। ৭০-৮০ বছরের পুরোনো খাতা, ধরা যাচ্ছে না, ভেঙে ভেঙে পড়ে যাচ্ছে। এগুলোকে কোনোপ্রকারে আমি যদি প্রিন্টে দিয়ে যেতে পারি, তারপর পরের প্রজন্মের লোকে পড়ুক, না পড়ুক, এ নিয়ে কাজ করুক না করুক, ম্যানুস্ক্রিপ্ট তো রইল। নষ্ট তো হয়ে গেল না। এটা করতে পেরে আমি সুখী।
আনিসঃ জীবনানন্দ যে এত ডায়েরি লিখে গেলেন, কেন লিখলেন। শেষ জীবনে একবার এগুলি পড়ে দেখবেন এ জন্য, নাকি ভবিষ্যৎ কালের জন্য এগুলো লিখে গেছেন?
ভূমেন্দ্রঃ সেটার উত্তর রিসেন্টলি পেয়েছি। এখন তাঁর যে খাতাগুলোর কাজ করছি এর একটি খাতার পেছনের মলাটের লেখা দেখে মনে হচ্ছে উনি একটা আত্মজীবনী লেখার কথা ভেবেছেন। চ্যাপ্টার বা স্তরগুলো সাজিয়েছেন। সঞ্জয় ভট্টাচার্যকে বলেছেনও, আত্মজীবনী লিখব ভাবছি। কিন্ত- আমি নিঃসন্দেহ, জীবনানন্দ আত্মজীবনী লিখতে পারতেন না।
আনিসঃ উনি অনেকগুলো গল্প-উপন্যাস লিখলেন। কিন্ত- যখন নিজের কথা লিখেছেন, বলছেন উপন্যাস লিখতে চাই। তাহলে এত কিছু যে লিখলেন, এসব রচনাকে তিনি কী ভাবতেন?
ভূমেন্দ্রঃ তিনি লিখেছেন, কিন্ত- প্রকাশ করতে হবে, এ রকম ধারণা তাঁর কখনোই ছিল না। না হলে দুই হাজারের ওপরে কবিতা লিখে মাত্র ১৬৬টা কবিতা প্রকাশ করতেন না। করার জায়গাও ছিল না।
আনিসঃ অনেকদিন পরে বাংলাদেশে এলেন?
ভূমেন্দ্রঃ ১০ বছর পরে এলাম।
রাশেদঃ বরিশালে শেষ করে গেছেন?
ভূমেন্দ্রঃ ১৯৪৬ সালে বরিশাল ছেড়েছি। আর যাইনি। এবার গেলাম।
আনিসঃ নির্জনতম কবি থেকে এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি উদ্‌যাপিত কবি হয়ে উঠলেন জীবনানন্দ। আপনি এর সবটা দেখলেন-এ সমপর্কে আপনার উপলব্ধি কী?
ভূমেন্দ্রঃ আমরা জানতাম, জীবনানন্দ জৈবনিক কবি, দেবতা তাঁর জীবন। জীবনে কষ্ট হতে পারে, সাময়িক অবক্ষয় আসতে পারে-কিন্ত- জীবন শেষ পর্যন্ত অপরাজেয়। যেহেতু জীবনানন্দ জৈবনিক কবি, জীবনানন্দ একদিন স্বীকৃতি পাবেনই। যদি না জানতুম, তাহলে এত বছর ধরে কি সম্মুখ নাবিকি করা যেত, এত প্রতিকূল অবস্থায়, সবার বিপক্ষে গিয়ে?
রাশেদঃ আমরা প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে পড়েছি। আপনি জীবনানন্দের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। তাঁকে কাছে থেকে দেখেছেন। তাঁকে কথা বলতে দেখেছেন, হাঁটতে দেখেছেন। তাঁর সঙ্গে আপনার ঘটেছে-এমন একটা স্নৃতির কথা বলুন। যেখানে আমরা জীবনানন্দকে দেখতে পাব।
ভূমেন্দ্রঃ ভারী, না হালকা?
আনিসঃ একটা হালকা, একটা ভারী।
ভূমেন্দ্রঃ প্রথমে হালকাটা বলি। জীবনানন্দের টাক নিয়ে একটা বাতিকতা ছিল। চুল উঠে যেত। ছোট টাকটিকে নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। টাক ঢাকার জন্য বা নতুন করে চুল গজাবার জন্য যে যত উপদেশ দিতেন, মান্য করতেন। মহাভৃঙ্গরাজ জবাকুসুম তৈল, হোমিওপ্যাথিক ওষুধ অনেক করেছেন। বিকেলে, সন্ধেবেলা উনি বাইরে বেড়াতে বেরোতেন, আবার রাত্তির নটা-সাড়ে নটায় বেড়াতে বেরোতেন, সমস্ত রাত বেড়িয়ে রাত তিনটে-সাড়ে তিনটেয় ফিরতেন। একদিন বিকেলে বেরোলেন, সঙ্গে আমি। উনি বললেন, ?দেখো তো,? মাথা নামিয়ে আনলেন, ?টাক দেখা যাচ্ছে?? আমি বললাম, ?দেখা যাচ্ছে না।? ?ভালো করে দেখো, দেখা যাচ্ছে না তো?? আমি বললাম, ?একদমই দেখা যাচ্ছে না।?
আনিসঃ এবার ভারীটা বলুন।
ভূমেন্দ্রঃ জীবনানন্দ সঞ্জয়বাবুর বাড়ি গেছেন। ফেরার সময় সঞ্জয়বাবু বললেন, ?ভূমেন, তুমি জীবনবাবুকে বাসে তুলে দাও।? জীবনানন্দ বাসে উঠেছেন। আমিও উঠে পড়েছি। সবুজ রঙের দোতলা বাস, ছাতখোলা। ওপরে গিয়ে দোতলায় পাশাপাশি বসেছি। ছেলেবেলার দুষ্টু বুদ্ধি, দুম করে বলে ফেললাম, ?লোকে বলে, আপনি নাকি ?বনলতা সেন? কবিতাটা অ্যাডগার অ্যালান পোর ?টু হেলেন? থেকে মেরেছেন, ?হায় চিল? কবিতাটার সঙ্গে নাকি ডব্লিউ বি ইয়েটসয়ের ?ও কাররিউ?র মিল আছে?? শুনে তিনি চুপ করে থাকলেন। কিছুক্ষণ পরে বললেন, ?তুমি কি কুম্ভীলকবৃত্তির কথা বলছ?? বললাম, ?তা না, লোকে বলে।? তিনি বললেন, ?তুমি যে সমাজে বাস করো, সে সমাজের ভাষাও তোমার জিভে চলে আসে। তুমি বাংলা ভাষায় কেন কথা বলো? ছেলেবেলায় তুমি বাঙালিসমাজে বড় হয়ে উঠেছ। অতএব বাংলা ভাষা তোমার জিভে আছে। তুমি যদি অ্যাডগার অ্যালান পোর, ইয়েটসের, কিটসের বা এলিয়টের সমাজে বাস করো, তোমার জিভে কী ভাষা আসবে? সেই ভাষাই চলে আসে জিভে। তাকে কুম্ভীলকবৃত্তি বলে না।?
দেশপ্রিয় পার্ক এসে পড়ল। নেমে পড়লুম। দুজনেই।

সোমবার, ২৩ মে, ২০১১

চাবি

শক্তি চট্টোপাধ্যায়

আমার কাছে এখনও পরে আছে তোমার প্রিয় হারিয়ে যাওয়া চাবি
কেমন করে তোরঙ্গ আজ খোলো?
থুৎনি 'পরে তিল তো তোমার আছে
এখন? ও মন নতুন দেশে যাবি?
চিঠি তোমায় হঠাৎ লিখতে হলো।
চাবি তোমার পরম যত্নে কাছে রেখেছিলাম, আজই সময় হলো--
লিখিও উহা ফিরৎ চাহো কিনা?
অবান্তর স্মৃতির ভিতর আছে
তোমার মুখ অশ্রু ঝলোমলো।
লিখিও উহা ফিরৎ চাহো কিনা?

ফেরারি মুখ

লেখক রুদ্র গোস্বামী

এক প্রসন্ন বৈশাখী বিকেলে
দেখেছি তোমার মুখ;
তোমাকে দেখার অপেক্ষায় দেখিনি সুন্দর দীর্ঘ বরষ।
শত মোহনা পেরিয়ে-
বহু ক্লান্ত রাত্রি হেঁটে এসেও না।
দৈনিক চোখে চকোরের মতো
সেদিনের দীপ্ত জ্যোৎস্না সুখ নিয়ে
এখনও চেয়ে আছি-
গোধুলির ছায়াপথে ।।

শুকতারা

লেখক- রুদ্র গোস্বামী

বোকা মেয়েটাকে কে যেন চিনিয়েছিল শুকতারাটাকে
তারপর মেয়েটা সময়ের আঁচলে গেঁথেছে শুধু সোহাগী প্রত্যাশা

আঁধারের জল লেগে দুটো হাত থেকে থেকে ফিরেছে কতবার!
আসেনি আদুরে আলো

সেদিন নদীর লহরে লহরে মারন লেগেছিল তারাটার
আর মেয়েটার বুকে আফিমে মাতন
এত কাছ থেকে মেয়েটা কখনো দেখেনি সুখের চমক!
ঝপাৎ শব্দে টোল পড়া নদী জল-
নিমেষে ছুঁয়ে যায়
ঘাসের মেখলা পড়া নদীপার
চিরজীবনের মতো পেয়ে যায়
মেয়েটা
সুখনক্ষত্রটাকে..........

অপেক্ষা

by রুদ্র গোস্বামী

তোর চোখের মাপের
আকাশ আমি নই
তাই উড়তে বলিনি তোকে

তোর মনের মাপের
বাসাও নেই এ বুকে
তাই বসতে বলিনি আরবার

কিন্তু পাখি
তবু বলি শোন-

আমার আকাশে সীমানা
রাখিনি আমি
খাঁচাও রেখেছি খুলে

ফিরে দেখিস তোর আকাশে
ঝড় এলে……………

সোমবার, ১১ এপ্রিল, ২০১১

Somebody's Me

You
Do you remember me like I remember you
Do you spend your life going back in your mind to the time

Coz I
I walk the streets alone I hate being my own
and everyone can see that I real fair and I'm going for her
thinking about you was somebody else

Somebody wants you
Somebody needs you
Somebody dreams about you every single night
Somebody can't breathe without you it's lonely
Somebody holds I won't think you will see
That somebody's me
That somebody's me

How
How did we go wrong
It was so good and now it's gone
Then I pray at night
that our passing will cross
what we had is a lost
Coz you're always you're here in my lost

Somebody wants you
Somebody needs you
Somebody dreams about you every single night
Somebody can't breathe without you it's lonely
Somebody holds at someday you will see
That somebody's me oh yeah

You'll always be in my life
Even if I'm not in your life
It's in my memory

Now when you remember me
And before you set me free
Oh listen please

Somebody wants you
Somebody needs you
Somebody dreams about you every single night
Somebody can't breathe without you it's lonely
Somebody holds that someday you will see
That somebody's me
(yeaaheeyeeh)
Somebody's me
Somebody's me
Somebody's me

সোমবার, ২৮ মার্চ, ২০১১

Addicted

Have I told you how good it feels to be me,
when I'm in you?
I can only stay clean
when you are around.
Don't let me fall.
If I close my eyes forever,
would it ease the pain?
Could I breathe again?


Maybe I'm addicted,
I'm out of control,
but you're the drug
that keeps me from dying.
Maybe I'm a liar,
but all I really know is
you're the only reason I'm trying.

I am wasted away,
I made a million mistakes.
Am I too late?
There is a storm in my head;
it rains on my bed
when you are not here.
I'm not afraid of dying,
but I am afraid of losing you.


Maybe I'm addicted,
I'm out of control,
but you're the drug
that keeps me from dying.
Maybe I'm a liar,
but all I really know is
you're the only reason I'm trying.

When you're lying next to me
love is going through to me.
Oh it's beautiful.
Everything is clear to me
'till I hit reality
and I lose it all...
I lose it all...
I lose it all.
I lose it all...
Nah nah nah
nah nah nah....
Nah nah nah nah nah nah.....
nah nah nah nah nah nah....

You're the only reason,
Yeah, you're the only reason I'm trying,
Oh, I'm trying, I'm trying, I'm trying,
Don't want to lose it all,
Don't want to lose it all,
I'm trying, I'm trying..
I'm trying ...
Yeah, you know I'm addicted,
You know I'm addicted,
Yeah, you know I'm addicted....

ফিরে এস

ফিরে এস সমুদ্রের ধারে;
ফিরে এস প্রান্তরের পথে,
যেইখানে ট্রেন এসে থামে
আম নিম ঝাউয়ের জগতে
ফিরে এস ; একদিন নীল দিম করেছো বুনন ;
আজো তারা শিশিরে নীরব ;
পাখির ঝরনা হ’য়ে কবে
আমারে করিবে অনুভব!

শুক্রবার, ২৫ মার্চ, ২০১১

আহা, আজি এ বসন্তে


আহা, আজি এ বসন্তে এত ফুল ফুটে,
এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়
সখীর হৃদয় কুসুমকোমল-
কার অনাদরে আজি ঝরে যায়!
কেন কাছে আস’, কেন মিছে হাসো’,
কাছে যে আসিত সে ত আসিতে না চায়।
সুখে আছে যারা সুখে থাক তারা,
সুখের বসন্ত সুখে হোক সারা-
দুখিনী নারীর নয়নের নীর
সুখিজনে যেন দেখিতে না পায়।
তারা দেখেও দেখে না,
তারা বুঝেও বুঝে না,
তারা ফিরেও না চায়।।

মঙ্গলবার, ১৫ মার্চ, ২০১১

জীবনানন্দ ও কল্লোল যুগ - ক্লিনটন বুথ সিলি


জীবনানন্দ ও কল্লোল যুগ - ক্লিনটন বুথ সিলি


কবি জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে মার্কিন লেখক ক্লিনটন বুথ সিলি লিখেছিলেন আ পোয়েট অ্যাপার্ট। বইটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আ পোয়েট অ্যাপার্ট-এর নির্বাচিত একটা অংশ এখানে ছাপা হলো। অনুবাদ করেছেন ফারুক মঈনউদ্দীন।
লেখাটি প্রথম আলো থেকে সংগ্রহিত।
কল্লোল-এ জীবনানন্দের প্রথম কবিতা ‘নীলিমা’ যখন ছাপা হয় তখন পত্রিকাটির তৃতীয় বর্ষ চলছিল।
‘নীলিমা’ কবিতাটি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এবং কল্পনাশক্তির মিশ্রণে জীবনানন্দের পারঙ্গমতা প্রদর্শন করে। এখানে তিনি ভোরবেলায় একটা নগর এবং আকাশকে দেখে অনুভব করেন। পরবর্তীকালে তিনি সূর্যোদয়ের মতো প্রাকৃতিক বিষয়ের ঘ্রাণ, আস্বাদ এবং শ্রবণ লাভ করবেন। তাঁর কল্পনাপ্রবণ চোখ আরও এজাতীয় জিনিস দেখবে রেশমগুটির অন্ধকারে আবৃত কীটসদৃশ পৃথিবীর মতো, আকাশে তারা উঠলে ফেটে যাবে তা।কবিতাটিতে ধানখেত আর তালগাছে ঘেরা ছোট শহরের মফস্বলের মানুষ জীবনানন্দের নগরের প্রতি বিরাগ স্পষ্ট। ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে তিনি থাকতেন ‘নিঃসহায় নগরের কারাগার-প্রাচীরের পারে’! বাংলার রাজধানী এবং সম্রাজ্যের দ্বিতীয় নগর কলকাতা যেসব কারণে উন্মত্ত জনতাকে প্রলুব্ধ করত, তার মধ্যে একটা বড় শহরের কর্মসংস্থানের সুযোগও আছে। সেখানে, ‘অগনন যাত্রিকের প্রাণ/ খুঁজে মরে অনিবার, পায়নাকো পথের সন্ধান;/ চরণে জড়ায়ে গেছে শাসনের কঠিন শৃঙ্খল,—/ নিষ্করুণ এই রাজপথ/লক্ষকোটি মুমূর্ষুর এই কারাগার,...’।
জীবনানন্দ শহরকে দেখান অনাকর্ষণীয় ধোঁয়ায় ঢাকা হিসেবে। যাঁরা কলকাতায় থেকেছেন তাঁরা জানেন, ঘরের রান্নার জন্য কাঠকয়লা আর পাথুরে কয়লার ধোঁয়া সম্পর্কে, যা প্রায়ই জ্বালানো হয় শুকনো গোবরের ঘুঁটে দিয়ে। সকালে একবার আর সন্ধ্যাবেলা, দিনে দুইবার পানির বালতির আকারের এই চুলাগুলো জ্বালিয়ে রান্নাঘরকে অনিবার্য ধোঁয়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বাইরে বসানো হয়। ‘—উদ্বেলিছে হেথা গাঢ় ধূম্রের কুণ্ডলী, উগ্র চুল্লিবহ্নি হেথা অনিবার উঠিতেছে জ্বলি’, একবার ভোরে আরেকবার রাতের বেলায় ‘ধূম্রগর্ভ বিস্মৃত আঁধার’ আকাশে মিলিয়ে যায়।
প্রকৃতির সেই দান আকাশকে নগরবাসীর কাছ থেকে স্থগিত করে রাখা হয়নি, নগরের কয়েদিদের জন্যও দেয় নিষ্কৃতি। ‘হে নীলিমা নিষ্পলক, লক্ষ বিধিবিধানের এই কারাতল/ তোমার ও মায়াদণ্ডে ভেঙেছ মায়াবী।’
এরপরের পঙিক্তগুলোতে ধরা আছে জীবনানন্দের সারকথা: ‘জনতার কোলাহলে একা বসে ভাবি।/ কোন্ দূর জাদুপুর—রহস্যের ইন্দ্রজাল মাখি/ বাস্তবের রক্ততটে আসিলে একাকী!/ স্ফটিক আলোকে তব বিথারিয়া নীলাম্বরখানা/ মৌন স্বপ্ন ময়ূরের ডানা!’
জীবনের বেশির ভাগ সময় শারীরিকভাবে না হলেও আবেগের সঙ্গে একাকী বসে থেকেছেন তিনি, এবং চিন্তা করেছেন সবচাইতে চমকপ্রদ উপায়ে।
১৯২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে কল্লোলে যখন ‘নীলিমা’ ছাপা হয়, তখন সঠিক কবিতাটি স্পষ্টতই সঠিক ক্ষেত্র পেয়েছিল। কারণ লেখাটা বহু তরুণ কবির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তাঁর স্মৃতিকথা কল্লোল যুগ-এ বলেন যে কবিতাটা পড়ে তিনি এতই চমৎকৃত হন যে তিনি তৎক্ষণাৎ অপরিচিত এই কবির সঙ্গে পরিচিত হতে চলে যান। সে সময় জীবনানন্দ হ্যারিসন রোডের (বর্তমানে মহাত্মা গান্ধী রোড) সামান্য পরে প্রেসিডেন্সি বোর্ডিংয়ে থাকতেন। সেখান থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং তাঁর কর্মক্ষেত্র সিটি কলেজ ছিল সহজ হাঁটা-দূরত্বে। ১৯৪৯ সালে কল্লোল যুগ বের হওয়ার প্রতিক্রিয়া হিসেবে জীবনানন্দ অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তকে লিখেছিলেন, ‘তুমি Presidency Boarding-এ প্রায়ই আসতে বেড়াতে বেরুতাম তারপর চৌরঙ্গীর দিকে প্রায়ই। অনেক কথা মনে পড়ছে অনেক অনবলীন দিন মাস মুহূর্তের।’
কয়েকজন তরুণ লেখক, প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং বুদ্ধদেব বসু স্মরণ করেন, জীবনানন্দের প্রথম যে কবিতাটি তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সেটি হচ্ছে ‘নীলিমা’। এই দুজনকে দুটো আলাদা পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তাঁদের সতীর্থ এই কবির সমর্থনে অনেক কিছু করতে হয়েছে। সে বছরই প্রেমেন্দ্র মিত্র আরও দুজনের সঙ্গে কলকাতা থেকে নতুনধারার সাহিত্যের দ্বিতীয় প্রধান কাগজ কালি কলম প্রকাশ করেন। এই কাগজে জীবনানন্দের বহু কবিতা ছাপা হয়। তার এক বছর পর বুদ্ধদেব বসু এবং অজিত দত্ত ঢাকা থেকে বের করেন তরুণ লেখকদের তৃতীয় কণ্ঠস্বর প্রগতি। যদিও এই তিনটি কাগজ কোনোভাবেই ১৯২০-এর দশকের অগ্রসর লেখকদের সৃষ্টির একমাত্র প্রদর্শনী ছিল না। তবে এগুলো ছিল তাঁদের মূল মাধ্যম, যা কল্লোল যুগ নামে পরিচিত আন্দোলনের ধারাটি রচনা করেছিল।
জীবনানন্দের ‘নীলিমা’ যখন বের হয়, তখন মাত্র ১৭ বছরের বুদ্ধদেব ঢাকার একটা কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। কিন্তু বুদ্ধদেবই সাহিত্য সমালোচক হিসেবে তাঁর চেয়ে ১০ বছরের বড় অপরিচিত কবি জীবনানন্দকে আবিষ্কার করে সামনের সারিতে নিয়ে আসেন। কল্লোল জীবনানন্দের কবিতা ছাপলেও কাগজটির লোকজন অজিত দত্তের মতো সত্যিকারভাবে জীবনানন্দের কবিতার মুগ্ধ পাঠক ছিলেন না। ‘বিশেষত ওর বড় বড় কবিতাগুলি ছাপবার মতো অতটা স্থান দিতেও বোধহয় কল্লোল কর্তৃপক্ষের আপত্তি ছিল। কিন্তু প্রগতিতে ওর দীর্ঘ কবিতাগুলি আমরা খুশি হয়ে সমাদরে ছাপতাম।’ প্রগতি কেবল জীবনানন্দের কবিতা ছাপেনি, বুদ্ধদেব নিজে দায়িত্ব নিয়েছিলেন জীবনানন্দের ওপর দুটো সম্পাদকীয় লেখার, যা ছিল তাঁর ওপর লেখা প্রথম আলোচনা।
প্রগতি প্রকাশিত হতে শুরু করে ১৯২৭ সালে। সে বছরের আগস্টে একটা দুর্দান্ত কাগজের পুনরাবির্ভাব ঘটে। শনিবারের চিঠি এবং তার চালিকাশক্তি সজনীকান্ত দাস নান্দনিক শয়তানের ওকালতি ভূমিকা গ্রহণ করেন। শনিবারের চিঠি ১৯২০ ও ৩০-এর দশকের সাহিত্যিকদের লেখার প্যারোডি লিখে তখনকার অগ্রসর ধারাকে সুনামহানির প্রচেষ্টায় খুব কম লেখককেই ছাড় দিয়েছে। একজন সাহিত্য-ইতিহাসবিদ লেখেন:
‘নজরুলকে আক্রমণ করিয়া সজনীকান্তের সাহিত্যজীবনের সূচনা ঘটে। ক্রমে প্রায় প্রত্যেক খ্যাতিমান লেখক তাঁহার সমালোচনায় এভাবে আক্রান্ত হইতে থাকেন যে তাঁহার বা শনিবারের চিঠির আক্রমণের লক্ষ্য হওয়া সাহিত্যে প্রতিষ্ঠার পরিচায়ক হইতে দাঁড়ায়।’
আগে থেকেই যেমন বোঝা গেছে, জীবনানন্দ সজনীকান্তের বহু কণ্টকাকীর্ণ গোলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন।
জীবনানন্দের প্রথম বই ঝরা পালক বের হয় ১৯২৭-এর শরৎকালে। এটাতে ছিল ৩৫টা কবিতা, যার কয়েকটা প্রথম প্রকাশিত হয় কল্লোল ও কালি কলম-এ, আর একটা ছাপা হয়েছিল প্রগতিতে। তিনি পরবর্তীকালে বইটির কবিতাগুলো প্রত্যাহার করেন। আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাস লিখতে চাইছিলেন, এমন একজনের কাছে তিনি ১৯৪৬ সালের ২ জুলাই তারিখের এক চিঠিতে লেখেন: ‘প্রথম কবিতার বইটি পাঠাব কিনা ভাবছি, সে বইয়ের বিশেষ কোনো importance আছে বলে মনে হয় না।’ এ সত্ত্বেও এই ৩৫টির মধ্যে তিনটি, মাত্র তিনটি কবিতা ১৯৫৪ সালে তাঁর জীবনের শেষ দিকে এসে প্রকাশিত জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতার অন্তর্ভুক্ত করতে দিয়েছিলেন তিনি। এই তিনটি ছিল ‘নীলিমা’, ‘পিরামিড’ ও ‘সেদিন এধরনীর’—যে কবিতাগুলো জীবনানন্দের ভবিষ্যৎ কাব্যিক ভাবনা এবং বিষয়বস্তু সম্পর্কে পূর্বাভাস দেয়।
সম্ভবত ভারতের মনোযোগ তুরস্কের এবং মেলামেশার সুবাদে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘুরে গিয়েছিল। সে কারণে জীবনানন্দের কাব্যদৃষ্টি ভারতের পশ্চিমের দেশগুলোর ওপর পড়ে। তবে নজরুলের সমসাময়িক বিষয়াবলির ওপর আলোকপাত করার বিপরীতে জীবনানন্দের আগ্রহ ছিল মিসর ও ব্যাবিলনের প্রাচীন সভ্যতার ওপর। মিসরের ফারাও এবং সম্রাজ্ঞীরা, সে দেশের পিরামিড এবং মমি—এসবের ওপর সারা জীবন, বিশেষ করে তাঁর কবিজীবনের প্রথম দিকে ছিল বিশেষ আকর্ষণ। এমনকি তাঁর ঝরা পালক গ্রন্থের একটা কবিতার নাম ‘মিশর’।এর প্রথম চার লাইনের মধ্যেই মমি, স্ফিংকস এবং পিরামিড—এসব শব্দ উদারভাবে ছড়ানো। যেকোনো কবিতায় পিরামিডের উল্লেখ থাকলে সেটাতে চমকপ্রদ এক স্বাদ পাওয়া যেত। উপরন্তু এসব সময়োত্তীর্ণ স্থাপনা এবং বিষয়ের কারণে কলমের এক আঁচড়ে কবি অনন্তের মধ্য দিয়ে চলে যেতে পারতেন। আর জীবনানন্দ বছর কিংবা জীবনকালের বদলে ভাবতেন অনন্তকাল নিয়ে।
নামেই যে কবিতাটিকে তাৎক্ষণিকভাবে স্থাপন করে মধ্যপ্রাচ্যে, সেই ‘পিরামিড’ কবিতায় সময়, মৃত্যু ও অমরত্বকে ঘনিষ্ঠভাবে অবলোকন করা হয়েছে। ‘বেলা বয়ে যায়!/ গোধূলির মেঘ সীমানায়/ ধূম্র মৌন সাঁঝে/ নিত্য নব দিবসের মৃত্যুঘণ্টা বাজে!/ শতাব্দীর শবদেহে শ্মশানের ভস্মবহ্নি জ্বলে!’
কথক মৃত্যু আর প্রাচীনতার প্রতীকের কথা বলে: ‘কার লাগি হে সমাধি তুমি একা বসে আছো আজ/ কী এক বিক্ষুব্ধ প্রেতকায়ার মতন!’
এমনকি জীবনানন্দ যখন ইতিপূর্বে দেখা বর্তমানের ওপর ভাবছেন, তাঁর চিত্রকল্পগুলো তখনো অতীতাশ্রয়ী হয়, যেমন তিনি ভোরকে আহ্বান করার জন্য তলব করছেন প্রাচীন মিসরের মেম্ন্নন নামের প্রকাণ্ড মূর্তিদ্বয়কে। ‘জ্বলিয়া যেতেছে নিত্য নিশি-অবসানে/ নূতন ভাস্কর!/ বেজে ওঠে অনাহত মেম্ননের স্বর/ নবোদিত অরুণের সনে/ কোন আশা-দুরাশার ক্ষণস্থায়ী অঙুলি-তাড়নে!’
সময় ও মহাশূন্যের এমন বিস্মৃতি জীবনানন্দের বহু কবিতায় স্বাতন্ত্র্যের ছাপ রেখে যায়। তিনি বাস করতেন তাঁর নিজের অদ্ভুত কল্পনার জগতে, যার অভিজ্ঞতা তিনি সঞ্চয় করেছেন কিছুটা উর্বর, অতি-আবেগাক্রান্ত কল্পনাশক্তির মাধ্যমে বোধকে তীব্রতর করে, এবং যা মানুষের একান্তভাবে শারীরিক বোধের ওপর নির্ভরতার কিছু সীমাবদ্ধতার অভিজ্ঞতার কথা জানত। বহু পরে জীবনানন্দ তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে সত্যিকার সমসাময়িক বাস্তবতার দিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন, তবে তাঁর সাফল্য ছিল সীমিত। তিনি উজ্জ্ব্বল থাকেন যখন প্রাকৃতিক মহাশূন্য এবং সময় থাকে উদ্দীপিত, গণ্ডিবদ্ধ নয়।
তাঁর বহু কবিতায় মৃত্যু পরিব্যাপ্ত থাকলেও জীবনানন্দের কাব্যিক ভুবন স্পন্দমানভাবে জীবন্ত। ‘সেদিন এ ধরণীর’ কবিতায় তিনি প্রকৃতির ওপর এমন মানবীয় গুণাবলি আরোপ করেন যে ভোর, তারকামণ্ডলী, হাওয়া, ঘাস এমনকি বিশ্বমাতা নিজেই জীবনের অলংকার পরে নেন। “চকিতে ছিঁড়িয়া গেল ধরণীর নাড়ীর বন্ধন—/ শুনেছিনু কান পেতে জননীর স্থবির ক্রন্দন,/ মোর তরে পিছু ডাক মাটি-মা তোমার!/ ডেকেছিল ভিজে ঘাস—হেমন্তের হিম মাস, জোনাকির ঝাড়!/ আমারে ডাকিয়াছিল আলেয়ার লাল মাঠ—শ্মশানের খেয়াঘাট আসি!’
অবশ্য বিশ্বকে, ভারত কিংবা বাংলাদেশকে মায়ের ভূমিকায় দেখার চেয়ে প্রকৃতিকে ব্যক্তিকরণ নতুন কিছু নয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস আনন্দমঠ (১৮৮২) দেখায়, বিপ্লবীরা স্লোগান দিচ্ছে ‘বন্দে মাতরম’, যার মাধ্যমে মাতৃভূমি অথবা ভারতমাতাকে সম্ভাষণ জানানো হয়। (এই স্লোগান পরবর্তীকালে সত্যিকার বাঙালি বিপ্লবীরা গ্রহণ করেছিল, এবং আজ অবধি শোনা যায় দ্বিতীয় জাতীয় সংগীতের মতো)। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলাকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করে। বিমানবিক পরিবেশের মাধ্যমে জীবনকে জীবিত বা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টায় জীবনানন্দ যে তীব্রতায় বাংলাতে প্রাণসঞ্চার করবেন সেটা লক্ষণীয়।
ঝরা পালক কোনো অর্থেই খুব বেশি সাফল্য পায়নি। কল্লোল বইটির প্রকাশনার খবর দিয়ে জীবনানন্দের কবিতা সম্পর্কে সাধারণ কিছু আলোচনা করে নিয়ম রক্ষা করেছিল।
জীবনানন্দ বৈদ্য জাতের পদবি দাশগুপ্ত নামে লেখা শুরু করেছিলেন, যেটা তাঁর ঠাকুরদা ব্রাহ্মসমাজে যোগ দেওয়ার পর ছেঁটে দাশ করে দিয়েছিলেন। তাঁর বাবা ও ঠাকুরদার মতো তিনিও ‘গুপ্ত’ বাদ দিয়ে দেন। বইটির প্রচ্ছদ এবং ভূমিকা দুই জায়গাতেই কবির নাম ছিল জীবনানন্দ দাশ। কল্লোল অবশ্য তখনো তাঁকে দাশগুপ্ত হিসেবেই জানে।
আরেকটা আলোচনা লেখা হয়েছিল, কিন্তু সেটা কখনোই ছাপা হয়নি। সিটি কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক এবং ব্রাহ্ম সরোজেন্দ্রনাথ রায়কে এক কপি জীবনানন্দের বই উপহার দেওয়া হয়েছিল। তিনি নিয়মিতভাবে বাংলা এবং ইংরেজি প্রবন্ধ লিখে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে পাঠাতেন, সেগুলো ছাপা হতো হয় মডার্ন রিভিউ অথবা প্রবাসীতে। এই সময় ঝরা পালক-এর ওপর তার লেখা আলোচনা ছাপা হয়নি। রামানন্দ পরবর্তীকালে সরোজেন্দ্রনাথের কাছে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, লেখাটা তিনি ছাপতে চেয়েছিলেন, তবে সহসম্পাদকদের একজন আপত্তি তুলেছিলেন। সে সময় প্রবাসীর সহসম্পাদক ছিলেন সজনীকান্ত। জীবনানন্দের পাঠানো ঝরা পালক পেয়ে রবীন্দ্রনাথ একটা জবাব দিয়েছিলেন, অবশ্য সেটা কখনোই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। বহু বছর পর জীবনানন্দ এই শ্রদ্ধেয় কবির কাছে লিখেছিলেন, ‘প্রায় নয় বছর আগে আমি আমার প্রথম কবিতার বই একখানা আপনাকে পাঠিয়েছিলুম। সেই বই পেয়ে আপনি আমাকে চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিখানা আমার মূল্যবান সম্পদের মধ্যে একটি।’
সজনীকান্ত দাস এবং তাঁর শনিবারের চিঠি শুধু জীবনানন্দ নয়, ১৯২০-এর দশকের সব অগ্রসর লেখককে বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই অদ্ভুত স্বভাবের লোকটি নতুন ধরনের সাহিত্যকে আরও স্পষ্টভাবে বোঝার সুযোগ করে দিয়েছিলেন বিরোধিতার মাধ্যমে। উপরন্তু ‘সাহিত্যের গুন্ডা’ নামে পরিচিত পত্রিকাটি যদিও সমসাময়িক বাঙালি লেখকদের ওপর আক্রমণ চালিয়েই উন্নতি লাভ করেছিল, তবু পত্রিকাটির সঙ্গে জড়িত একজন লেখক, মোহিতলাল মজুমদার কিছু গঠনমূলক সমালোচনা লিখেছিলেন। সত্যসুন্দর দাস ছদ্মনামে লিখে মোহিতলাল শনিবারের চিঠির প্রধান তাত্ত্বিক হিসেবে পরিগণিত ছিলেন।
১৯২০ সালের শেষভাগে কল্লোলের লেখকেরা যখন সাহিত্যের পরিচয়যোগ্য শক্তি হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হন, তাঁদের এ রকম বিরোধিতার মোকাবিলা করতে হয়েছিল। শব্দটির সবচেয়ে পরিশীলিত অর্থে তাঁদের লেখার পঙ্কিলতা তাঁদেরই অসন্তুষ্ট করেছে যাঁরা (যেমন ধরুন মোহিতলাল) মনে করেন, সাহিত্যকে মানবতার একটা বেদির ওপর রেখে দিতে হবে, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম হেঁটে যাওয়ার সময় দেখতে পায়। শিল্পের অমর কাজগুলো স্থানীয় মাটি থেকে করা নয়, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সম্মানজনক দূরত্বের খাঁটি মর্মর পাথর তুলে এনে তৈরি করতে হবে। মানুষের মহত্তম চরিত্রের মূল বিষয় হচ্ছে মন, দেহ নয়—যাকে এই জাদুঘরে রাখার সামগ্রীগুলোর সঙ্গে সম্মান করা উচিত। বেদির ওপর তাদের অবস্থানের সঙ্গে সংগতি রেখে অমর মানুষেরা কথা বলবে উচ্চকণ্ঠে, আবর্জনাতুল্য সাধারণ মানুষের মতো বিড়বিড় করে নয়।
সজনীকান্ত গং কাব্যশৈলীর অবক্ষয়ে এত বিরক্ত হন যে গদ্যের মতো মনে হওয়া এসব কাব্যচর্চাকে ব্যঙ্গ করার জন্য দুটো শব্দ মিলিয়ে তাঁরা একটা নতুন শব্দ আবিষ্কার করেন—‘গবিতা’, গদ্যের ‘গ’ এবং কবিতার ‘বিতা’ নিয়ে তৈরি শব্দটি ছিল একই রকম ইংরেজি শব্দ ‘Proetry’র একটা কাঁচা অনুবাদ। সজনীকান্তর এই শব্দটি মূলত ১৯৩০-এর দশকে কী ঘটবে তারই পূর্বাভাস ছিল, কারণ জীবনানন্দসহ আরও অনেকে এবং স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তখন গদ্য কবিতা লিখছিলেন। ‘গবিতা’ শব্দটি দিয়ে কল্লোল যুগের কবিদের কবিতার অবমূল্যায়ন করার চেষ্টা করছিলেন সজনীকান্ত।